শনিবার (২৯ আগস্ট) তেজগাঁও কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে রাজধানীর যানজট পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা শেষে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও ফ্লাইওভারে যানবাহনের চাপ, বাস টার্মিনালের অবস্থান, পার্কিং সংকট, গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা এবং ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের আধুনিক পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন জানান, রাজধানীর যানজট কমিয়ে নাগরিকদের চলাচল সহজ করতে বেশ কয়েকটি বিষয়ে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মধ্যে কিছু কাজ আগামী চার মাসের মধ্যে শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঢাকার এক্সপ্রেসওয়ে ও ফ্লাইওভারের টোল প্লাজাগুলোতে ইটিসি বা ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর ফলে যানবাহনকে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে টোল দেওয়ার প্রয়োজন কমবে এবং টোল আদায় প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও প্রযুক্তিনির্ভর হবে।
এ জন্য একটি বিশেষ অ্যাপ তৈরির সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আগামী চার মাসের মধ্যে অ্যাপটির উন্নয়ন কাজ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত এলাকা যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভারের আশপাশে যানজট কমানোর বিষয়েও বৈঠকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ এলাকার যান চলাচল স্বাভাবিক করতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) আগে যে প্রতিবেদন তৈরি করেছিল, সেটি পুনরায় পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
বুয়েটকে বিদ্যমান প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সুপারিশসহ নতুন একটি প্রতিবেদন ১৫ দিনের মধ্যে জমা দিতে বলা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক পুলিশের সমন্বয়ে সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
রাজধানীর কেন্দ্রীয় অংশে আন্তঃজেলা বাসের চাপ কমাতে ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল কেরানীগঞ্জে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বৈঠকে বলা হয়, ফুলবাড়িয়া থেকে বাস টার্মিনাল সরিয়ে নেওয়া হলে রাজধানীর কেন্দ্রীয় এলাকায় আন্তঃজেলা বাস ও অন্যান্য যানবাহনের চাপ কমবে। এর ফলে ওই এলাকার যানজট নিয়ন্ত্রণেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তবে স্থায়ী টার্মিনাল নির্মাণে সময় লাগবে। তাই এর আগেই ঝিলমিল প্রকল্পের ১৫ একর জমিতে অস্থায়ী বাস টার্মিনাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। আগামী চার মাসের মধ্যে এই অস্থায়ী টার্মিনাল চালুর লক্ষ্যে কাজ করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গণপরিবহনের চাপ সামলাতে গাবতলী বাস টার্মিনালের পেছনের অংশ সম্প্রসারণের সিদ্ধান্তও এসেছে বৈঠকে। এর মাধ্যমে টার্মিনালের ধারণক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বাস চলাচল ও পার্কিং ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই কাজ বাস্তবায়নে সড়ক বিভাগ, ট্রাফিক পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে বলা হয়েছে।
রাজধানীর যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবে ব্যস্ত সড়ক ও বাজারকেন্দ্রিক যানবাহনের চাপের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। এ কারণে কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেট গাবতলীতে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মার্কেট স্থানান্তরের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, কারওয়ান বাজারের ওপর থেকে বাজারকেন্দ্রিক যানবাহনের চাপ কমানো গেলে আশপাশের সড়কে যান চলাচল আরও স্বাভাবিক হতে পারে।
সচিবালয় এলাকায় যানজট নিয়ন্ত্রণে পার্কিং সুবিধা বাড়ানোর বিষয়েও সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ জন্য ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করা যায় কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।
পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী আরও বিকল্প পার্কিং স্পট চিহ্নিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সচিবালয়কেন্দ্রিক যানবাহনের চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং আশপাশের সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
রাজধানীতে অটোরিকশার চলাচলকে আরও নিয়মতান্ত্রিক করতে পৃথক নীতিমালা প্রণয়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মাধ্যমে অটোরিকশার চলাচল, ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণে একটি নির্দিষ্ট কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে।
অন্যদিকে অনুমোদন ছাড়া চলাচল করা ডাবল ডেকার স্লিপার বাসের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এসব যানবাহনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাজধানীর যানজট নিরসনে শুধু একটি সংস্থার উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে হবে। একই সঙ্গে যানজট নিয়ন্ত্রণে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।