• মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬, ০১:৫৬ অপরাহ্ন

৯ বছরেও কাটেনি সংকট, ঝুলে আছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন

কক্সবাজার প্রতিনিধি / ১৬ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬

কক্সবাজার প্রতিনিধি :

মিয়ানমারে নিপীড়নের মুখে নয় বছর আগে আজকের দিনে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে ঢল নেমেছিল লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর। অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই নিজ দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে প্রায় ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নেয় কক্সবাজারের শরণার্থীশিবিরে। ওই সময়েই তাদের প্রত্যাবাসনে তোড়জোড় শুরু হইয়েছিল যা এখনো চলমান। সময়ের সঙ্গে বদলেছে রাখাইনের পরিস্থিতি, পালটেছে সব হিসাব-নিকাশ। যুদ্ধ, নিরাপত্তাহীনতা ও নাগরিকত্বের সংকটে ঘরে ফেরার সব পথ এখনো বন্ধ। তবু নিজেদের ঘর, ভূমি ও পরিচয়ে ফেরার স্বপ্ন দেখছেন বাস্তুচ্যুতদের বড় একটি অংশ।

২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে পরিবারের চার সদস্যকে নিয়ে উখিয়ার কুতুপালংয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন রোহিঙ্গা যুবক মোহাম্মদ আরিফুল্লাহ। তিনি বলেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাত থেকে প্রাণ বাঁচিয়ে আট দিন হাঁটার পর এ দেশে এসেছিলাম। তখনকার কথা মনে পড়লে এখনো কান্না পায়। কিন্তু সেটা আমার দেশ। সেখানে আবার ফিরে যেতে চাই। শুধু আরিফুল্লাহ নন, দীর্ঘ শরণার্থীজীবনের পরও অনেক রোহিঙ্গার স্বপ্ন নিজ দেশে ফেরা। তবে রাখাইনের বর্তমান পরিস্থিতি সেই পথকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে এখন বড় বাধা রাখাইনের যুদ্ধ। মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির সংঘাতের কারণে অঞ্চলটি এখনো অস্থিতিশীল। ওই রাজ্যের বড় একটি অংশ বিদ্রোহী গোষ্ঠীটির নিয়ন্ত্রণে যাওয়ায় প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।

এর মধ্যে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে রাখাইনে সংঘাতের কারণে নতুন করে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। ইউএনএইচসিআরের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে বর্তমানে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখের বেশি। তাদের অধিকাংশই উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্পে বসবাস করছেন।

রোহিঙ্গাদের বড় উদ্বেগ প্রত্যাবাসনের পর নিরাপত্তা ও অধিকার। ইউএনএইচসিআরের কক্সবাজার সাব-অফিসের প্রধান মার্সেল কলুন বলেন, চলমান সংঘাত বন্ধ হওয়া প্রত্যাবাসনের অন্যতম প্রধান শর্ত। এরপর রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, নিজ ভূমিতে ফেরার সুযোগ, জমি-বাড়ির অধিকার ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

নাগরিকত্বও বড় প্রশ্ন। মিয়ানমারের ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের কারণে রোহিঙ্গাদের বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রহীন অবস্থায় রয়েছেন। নাগরিকত্ব ও সমাধিকার নিশ্চিত না হলে প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অধিকারকর্মী সৈয়দ উল্লাহ বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের কাছে একমাত্র সমাধান নিরাপদ প্রত্যাবাসন।’

প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে তালিকা যাচাইও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ রোহিঙ্গার তালিকা দিয়েছে। গত ৩১ জুলাই পর্যন্ত মিয়ানমার ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করেছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসাবে শনাক্ত করা হয়েছে। একে অগ্রগতি হিসাবে দেখা হলেও, তা এখনো বাস্তব প্রত্যাবাসনে রূপ নেয়নি। মিয়ানমার বলছে, নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে যাচাই করা ব্যক্তিদের নেওয়া হবে।

রোহিঙ্গারা কি নিজেদের পুরোনো গ্রামে ফিরতে পারবেন? জমি-বাড়ির মালিকানা ফিরে পাবেন? কাজ করার অধিকার থাকবে? তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে? কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, শুধু মানুষকে সীমান্তের ওপারে পাঠিয়ে দেওয়াই প্রত্যাবাসন নয়। মর্যাদার সঙ্গে ফেরার নিশ্চয়তা থাকতে হবে।

৯ বছরে রোহিঙ্গা সংকটের প্রভাব পড়েছে উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় জনজীবন, পরিবেশ, অর্থনীতি ও নিরাপত্তায়। স্থানীয়রাও চান, রোহিঙ্গারা নিরাপদে নিজ দেশে ফিরে যাক। এ প্রত্যাবাসন ঘিরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও রাখাইনের পরিস্থিতিতে বাস্তব অগ্রগতি আসছে না।

শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের একার নয়। বর্তমানে এটি আন্তর্জাতিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। প্রত্যাবাসনের রূপরেখা প্রণয়নসহ সমস্যা সমাধানে সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে।

আন্তর্জাতিক চাপ, বাংলাদেশ-মিয়ানমারের আলোচনা ও তালিকা যাচাই চললেও বাস্তবে একজন রোহিঙ্গাকে ৯ বছরে নিজ দেশে ফেরানো সম্ভব হয়নি। ২০১৭ সালের পর থেকে ২৫ আগস্টকে তারা রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবস পালন করেন।


More News Of This Category
bdit.com.bd