• শনিবার, ০২ মে ২০২৬, ০৫:৪৭ অপরাহ্ন

নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় ৭০ শতাংশ খালাস, সাজার হার ৩ শতাংশ!

ডেস্ক রিপোর্ট / ২৩ Time View
Update : শনিবার, ২ মে, ২০২৬

ডেস্ক রিপোর্ট 

দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত মামলায় সাজার হার উদ্বেগজনক। মামলায় মাত্র ৩ শতাংশের সাজা হচ্ছে, বিপরীতে প্রায় ৭০ শতাংশ খালাস পেয়ে যাচ্ছেন। বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল প্রমাণ, সাক্ষীর অনুপস্থিতি এবং কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এ পরিস্থিতির মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ উদ্যোগে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পদ্ধতিগত প্রতিবন্ধকতা এবং তা নিরসনের উপায়’ শীর্ষক এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।

শনিবার রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত এক সভায় এই গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়।

গবেষণাটি পরিচালনা করেন সাবেক জেলা ও দায়রা জজ উম্মে কুলসুম। এতে দেশের ৩২টি জেলার ৪৬টি ট্রাইব্যুনালে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত নিষ্পত্তি হওয়া ৪ হাজার ৪০টি মামলা বিশ্লেষণ করা হয়। মামলার সময়সীমা, মুলতবি সংখ্যা, শুনানির পুনরাবৃত্তি, সাক্ষী ও অভিযুক্তের তথ্য, ফরেনসিক প্রতিবেদন এবং রায়ের ধরন পর্যালোচনা করা হয়েছে।

গবেষণায় দেখা যায়, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও বাস্তবে একটি মামলা শেষ হতে গড়ে সময় লাগছে ৩ বছর ৭ মাস। প্রতিটি মামলায় গড়ে ২২ বার শুনানির তারিখ নির্ধারিত হচ্ছে, যা বিচারপ্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করছে।

বিচার বিলম্বের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে অভিযোগকারী ও সাক্ষীর অনুপস্থিতি, ঘন ঘন সময়ের আবেদন, তদন্তে ধীরগতি, দুর্বল প্রমাণ ব্যবস্থা এবং সাক্ষী সুরক্ষার অভাব।

গবেষণায় বলা হয়েছে, এসব মৌলিক সমস্যা সমাধান ছাড়া কেবল সময়সীমা নির্ধারণ করে কার্যকর ফল পাওয়া সম্ভব নয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বিচার বিভাগের সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের তিনটি প্রধান অঙ্গের মধ্যে বিচার বিভাগ সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত। জাতীয় বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় বিচার কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ছে।

মন্ত্রী জানান, বিচার বিভাগের জন্য বরাদ্দ প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা, যেখানে অন্যান্য খাতে বরাদ্দ এর চেয়েও বেশি। এই সীমিত বাজেটে বিচারকদের বেতন, প্রশাসনিক ব্যয় ও অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বিচার বিভাগের জন্য বরাদ্দ বাড়ানো এবং কাঠামোগত জটিলতা দূর করার ওপর জোর দেন।

পাশাপাশি জনবল কাঠামোয় অসামঞ্জস্যের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালত পর্যন্ত দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু এবং জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের কার্যক্রম আরও গতিশীল করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মঞ্জুরুল হোসেন বলেন, কম সাজার হার মানেই যে মামলা মিথ্যা—এ ধারণা সঠিক নয়। বাস্তবে নারীর প্রতি সহিংসতার বড় একটি অংশ সামাজিক লজ্জা, ভয় এবং মানসিকতার কারণে আদালতে পৌঁছায় না।

তিনি বলেন, কঠোর শাস্তির বিধান থাকায় অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্ত পক্ষ ভুক্তভোগীর পরিবারকে চাপ প্রয়োগ বা সমঝোতায় বাধ্য করার চেষ্টা করে। ফলে অনেক পরিবার সামাজিক ও মানসিক চাপে মামলা চালিয়ে যেতে নিরুৎসাহিত হয়।

মঞ্জুরুল হোসেন আরও বলেন, অধিকাংশ নির্যাতনের ঘটনা ঘরের ভেতরে ঘটে, যেখানে প্রত্যক্ষ সাক্ষী পাওয়া কঠিন। এতে প্রমাণ উপস্থাপন জটিল হয়ে পড়ে এবং মামলার ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়। দীর্ঘসূত্রতা ও আইনি জটিলতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী পক্ষ শেষ পর্যন্ত আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

তিনি বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত করতে আইন, স্বরাষ্ট্র, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও বিচার বিভাগের সমন্বয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন। তাঁর মতে, বিচারকদের সংবেদনশীল ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে এসব মামলার নিষ্পত্তি আরও দ্রুত ও কার্যকর হতে পারে।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ। স্বাগত বক্তব্য দেন ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষা এবং জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভারসিটি কর্মসূচির সহযোগী পরিচালক শাশ্বতী বিপ্লব।

তিনি বলেন, দেশে নারীর প্রতি সহিংসতা একটি গভীর সামাজিক সমস্যা। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৯০ শতাংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে সঙ্গীর দ্বারা সহিংসতার শিকার হন। সাম্প্রতিক জরিপগুলোতেও একই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।

সামগ্রিকভাবে গবেষণাটি নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার বিচারব্যবস্থায় বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা তুলে ধরার পাশাপাশি কার্যকর সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রমাণ সংগ্রহ, সাক্ষী সুরক্ষা, দ্রুত বিচার এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া এ পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি সম্ভব নয়।


More News Of This Category
bdit.com.bd