ডেস্ক রিপোর্ট :
৩০ শতাংশের জমি ৫৬ শতাংশ দেখিয়ে নামজারির অভিযোগ
গাজীপুর মহানগরের ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক দুই কাউন্সিলর ফজলুল হক চৌধুরী ও জুয়েল মন্ডলসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে জমি জালিয়াতি, প্রতারণা, জাল দলিল তৈরি ও জমির পরিমাণ বাড়িয়ে নামজারির অভিযোগে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর গাজীপুর কার্যালয় তদন্ত করছে।
মামলার বাদী মো. আলাউদ্দিন চৌধুরী জনী। তিনি গাজীপুরের বিজ্ঞ চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের গাছা আমলী আদালতে মামলাটি দায়ের করেন। এতে দণ্ডবিধির ৪০৬, ৪২০, ৪৬৪, ৪৬৭, ৪৬৮ ও ৪৭১ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকৃতপক্ষে ৩০ শতাংশ জমির মালিকানা থাকা সত্ত্বেও দলিল ও নামজারি-সংক্রান্ত কাগজপত্রে জমির পরিমাণ ৫৬ শতাংশ দেখানো হয়েছে। এভাবে অতিরিক্ত ২৬ শতাংশ জমি নিজেদের নামে নামজারি করে বাদীর মালিকানাধীন সম্পত্তির অংশ আত্মসাতের চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
মামলায় সাবেক দুই কাউন্সিলরসহ পাঁচজন আসামি
মামলার প্রথম আসামি ফজলুল হক চৌধুরী (৬৫) এবং দ্বিতীয় আসামি জুয়েল মন্ডল (৪০)। দুজনই গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর। অন্য তিন আসামি হলেন ফারহানা চৌধুরী বৃষ্টি (৩০), রাকিব চৌধুরী (২৮) ও রাব্বি চৌধুরী (২৫)। বাদীর অভিযোগ অনুযায়ী, শেষের তিনজন ফজলুল হক চৌধুরীর সন্তান।
দীর্ঘদিনের জমি নিয়ে বিরোধ
মামলার অভিযোগে বাদী উল্লেখ করেন, গাজীপুর মহানগরের গাছা থানাধীন কুনিয়া-পাছর এলাকায় জমির মালিকানা নিয়ে আসামিদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। তাঁর দাবি, তাঁর দাদা মৃত মো. আব্দুল খালেক বিভিন্ন নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির মালিকানা অর্জন করেন এবং দীর্ঘদিন তা ভোগদখলে রাখেন।
অভিযোগে বলা হয়, ১৯৯৯ সালের ৩ অক্টোবর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিবন্ধিত ১৩০৭৮ নম্বর এওয়াজ হেবা দলিলের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তি তাঁর নাতি মো. আলাউদ্দিন চৌধুরী জনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরবর্তীতে ২০১১ সালে নামজারি-জমাভাগের মাধ্যমে ৩৫৫০ নম্বর জোত খোলা হয় বলে মামলায় দাবি করা হয়েছে।
বাদীর অভিযোগ, ১৯৯৯ সালের ১৩০৭৭ নম্বর দলিলে প্রথম আসামির ক্রয়কৃত জমির পরিমাণ ৩০ শতাংশ উল্লেখ থাকলেও পরবর্তী সময়ে নামজারির কাগজপত্রে তা ৫৬ শতাংশ দেখানো হয়। এতে অতিরিক্ত ২৬ শতাংশ জমি নিয়ে বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে। এ কাজে অন্য আসামিরাও সহযোগিতা করেছেন বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
২০২৫ সালে জালিয়াতির বিষয়টি জানতে পারেন বাদী
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল নিজের জমির খাজনা ও নামজারি-সংক্রান্ত কাজ করতে গিয়ে বাদী জানতে পারেন, তাঁর সম্পত্তির অংশ আসামিদের নামে নামজারি করা হয়েছে। এরপর তিনি সংশ্লিষ্ট নামজারি বাতিলের আবেদন জানিয়ে টঙ্গী সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে একটি বিবিধ মামলা করেন। বাদীর দাবি, ওই মামলার প্রতিবেদনে তাঁর পক্ষে মতামত আসে।
পরবর্তীতে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে একাধিকবার সমঝোতার চেষ্টা করা হলেও বিরোধের নিষ্পত্তি হয়নি বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৫ জুলাই বাদী আসামিদের বাড়িতে গিয়ে বিতর্কিত নামজারি ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন। এ সময় আসামিরা তাঁর ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে খুন-জখমের হুমকি দেন এবং বাড়ি থেকে বের করে দেন বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
মামলার তফসিল অনুযায়ী, গাজীপুর জেলার গাছা থানাধীন কুনিয়া মৌজার এসএ খতিয়ান নম্বর ৯৮, আরএস খতিয়ান নম্বর ১৭০, এসএ দাগ নম্বর ৩০১ ও ৩০৩ এবং আরএস দাগ নম্বর ১৫০ ও ৫৪৬-এর জমি নিয়ে বিরোধ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট তফসিলে মোট জমির পরিমাণ ৬৭ শতাংশ উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে হেবা দলিলের মাধ্যমে ৩০ শতাংশ জমি পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন বাদী।
বাদীর অভিযোগ, প্রকৃত জমির পরিমাণের চেয়ে বেশি জমি দেখিয়ে নামজারি করার মাধ্যমে তাঁর মালিকানাধীন সম্পত্তির অংশ নিজেদের নামে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এ ঘটনায় আদালতের কাছে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ ও সুবিচার চেয়েছেন তিনি।
মামলাটি তদন্ত করছে গাজীপুর পিবিআই
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন জানান, মো. আলাউদ্দিন চৌধুরী জনী উল্লেখিত অভিযোগ এনে গাজীপুরের বিজ্ঞ আদালতে মামলা দায়ের করেন। আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), গাজীপুরকে দায়িত্ব দিয়েছেন।
তিনি বলেন, “মামলাটি তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তের মাধ্যমে সঠিক তথ্য উদ্ঘাটন করে প্রতিবেদন দেওয়া হবে। তদন্তের স্বার্থে এখন এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলা যাবে না।”
এ বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।