নিজস্ব প্রতিবেদক:
রবিবার (২৭ জুলাই ) সোয়া ৯টার দিকে টঙ্গীর হোসেন মার্কেট ইম্পেরিয়াল হাসপাতালের সামনে খোলা ড্রেনে পড়ে গিয়ে তাসনিম সিদ্দিকী জ্যোতি (২৪) নামের এক নারী নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সোমবার (২৮ জুলাই) সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (যুগ্মসচিব) মুহাম্মদ সোহেল হাসান। এসময় তিনি ফায়ার সার্ভিস ও সিটি কর্পোরেশনের টিমের সাথে কথা বলেন এবং উদ্ধার তৎপরতা নিয়ে বিভিন্ন দিক নির্দেশনা দেন।পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মুহাম্মদ সোহেল হাসান বলেন, ঢাকনাবিহীন ম্যানহোলের রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকি সড়ক বিভাগের। এটি সিটি করপোরেশনের সড়ক নয়। নিখোঁজ নারীর উদ্ধারে সিটি করপোরেশন জনবল ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি দিয়ে সহায়তা করে যাচ্ছে। পরিদর্শনে সচিব মোঃ আমিন আল পারভেজ, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সুদীপ বসাক, নির্বাহী প্রকৌশলী মাঈদুল ইসলাম, সহকারী প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মোঃ আরিফুল রহমান, উপ সহকারী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) মোঃ আমজাদ হোসেনসহ অন্যান্য কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।পরিদর্শনকালে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) সুদীপ বসাক সাংবাদিকদের বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। তবে এই ঘটনায় গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন কোন ভাবেই দায়ী নয়, কারণ মহাসড়ক ও ড্রেন (বিআরটিএ) কর্তৃপক্ষ এখনো সিটি কর্পোরেশনের নিকট দায়িত্ব হস্তান্তর করেনি। এরআগেও আমরা জায়গাটি পরিদর্শন করে বিআরটিএ কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি তারা কোন উদ্যোগ নেয়নি। জানা গেছে, ঘটনার পরপরই গাজীপুর ফায়ার সার্ভিস ও গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের যৌথ উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। নিখোঁজের দ্বিতীয় দিন পার হলেও সন্ধান মেলেনি হতভাগ্য তাসনিম সিদ্দিকী জ্যোতির। দিনভর ফায়ার সার্ভিস ও সিটি কর্পোরেশনের উদ্ধারকর্মীরা মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে তৎপর থাকলেও বিকেলে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্ধার অভিযান স্থগিতের ঘোষণা দেয় বাহিনীটি। টঙ্গী ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার মো. শাহীন আলম বলেন, ঘটনার পর উদ্ধারকারী ২০ সদস্যের দল ম্যানহোলের ভেতর নিখোঁজ ওই নারীর সন্ধানে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে। ম্যানহোলটির গভীরতা প্রায় দশ ফুট। দিনভর বৃষ্টি হওয়ায় ম্যানহোলটি পানিতে ভরপুর হয়ে গেছে। দ্বিতীয় দিন সিটি করপোরেশনের সহায়তায় ড্রেনের ঢাকনা পর্যায়ক্রমে উঠিয়ে অনুসন্ধান চালায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। কিন্তু উদ্ধারকর্মীরদের প্রাণান্ত প্রচেষ্টার পরেও তাসনিমের মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তবে ঘটনাস্থল থেকে নিখোঁজ তাসনিমের একজোড়া জুতা উদ্ধার করা হয়েছে।তদন্ত কমিটি গঠন: এ ব্যাপারে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের সচিবকে প্রধান করে ৪ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে ফায়ার সার্ভিসসহ অন্যান্য সেবা প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা হয়েছে। আগামী ৭ কর্মদিবসে তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্বজনরা: ম্যানহোলে তাসনিম সিদ্দিকী জ্যোতির নিখোঁজের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়েছেন নিহত তাসনিম সিদ্দিকীর স্বজনরা। তাসনিমকে এভাবে হারানোর জন্য হাসপাতাল ও সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি ও তাদের নজরদারির অভাবকে দায়ী করেছেন তারা। স্বজনরা জানান, ড্রেনের রক্ষণাবেক্ষণ সংস্থা ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণে এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে।তাসনিম সিদ্দিকীর চাচাতো বোন ঐশী বলেন, রাতে ইম্পেরিয়াল হাসপাতালে ওষুধ বিপণনের কাজে এসেছিলেন জ্যোতি। এরপর ম্যানহোলে পড়ে তার নিখোঁজের খবর পাই। কিন্তু দুপুর হয়ে গেলেও বোনের সন্ধান পাইনি। আমরা চাই জীবিত না হোক অন্তত তার লাশটি যেন পাই । এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রোববার (২৭ জুলাই) রাত সোয়া ৯টায় হোসেন মার্কেট এলাকায় স্থানীয় ইম্পেরিয়াল হাসপাতালে ওষুধ বিপণনের কাজে এসেছিলেন সেলসম্যান তাসনিম সিদ্দিকী জ্যোতি। বৃষ্টিপাত ও বৈরী আবহাওয়ায় হঠাৎ অসাবধানতাবশত হাসপাতালের সামনে ঢাকনাবিহীন ম্যানহোলে পড়ে যান তিনি। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধারে ব্যর্থ হয়ে ফায়ার সার্ভিসে খবর দেয়। এরপর ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট রাত দেড়টা পর্যন্ত তাদের উদ্ধার অভিযান চালায়। বৈরী আবহাওয়ায় উদ্ধার কাজ স্থগিত রেখে পরদিন সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ফের উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে ফায়ার সার্ভিস। তাদের সাথে যোগ দেয় সিটি করপোরেশন। ঢাকা ময়মনসিংহ মহাসড়কের হোসেন মার্কেট থেকে গাজীপুরা পর্যন্ত ড্রেনের ঢাকনা খুলে তল্লাশি চালায় ফায়ার সার্ভিস। এক পর্যায়ে গাজীপুরা এলাকায় বিল ও জলাশয়ে উদ্ধার অভিযান চালায় ডুবুরিরা। যা বললেন প্রত্যক্ষদর্শীরা: প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, টঙ্গী ইম্পেরিয়াল হাসপাতালের সামনের রাস্তার পাশে থাকা ড্রেনটি দীর্ঘদিন ধরে উন্মুক্ত ছিল। পূর্বে সেখানে স্লাব বসানো থাকলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের স্বার্থে তা তুলে লোহার গ্রিল বসায়, যা সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত ছিল। পরবর্তীতে সেই গ্রিলটি নষ্ট হয়ে গেলে পুনরায় সেখানে কোনো গ্রিল বা সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড বসানো হয়নি। এতে জায়গাটি ফাঁকা ও বিপজ্জনক অবস্থায় ছিল। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অসাবধানতাবশত জ্যোতি ড্রেনের ভেতর পড়ে যান এবং পানির প্রবল স্রোতে নিখোঁজ হয়ে যান। স্থানীয়দের অভিযোগ: এদিকে স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, ইম্পেরিয়াল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতা এই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। এমন ব্যস্ত এলাকায় ড্রেন খোলা রেখে মানুষকে মৃত্যুর মুখে ফেলে তারা জঘন্য অপরাধ করেছে। তারা আরো বলছেন, ম্যানহোলটি দীর্ঘ দিন ধরে এভাবে ঢাকনাবিহীন থাকলেও এটি সংস্কার ও মেরামতের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। হাসপাতাল ও সড়ক বিভাগের গাফিলতির কারণে এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। তবে অনেকেই ঘটনাস্থলে জড়ো হয়ে প্রাথমিকভাবে সিটি কর্পোরেশনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করলেও পরবর্তীতে ইম্পেরিয়াল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও (বিআরটিএ) প্রকল্প কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে গেলে ঢাকা ইম্পেরিয়াল হাসপাতাল ও রুটস অ্যান্ড হাইওয়ের কোনো কর্মকর্তাকে পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য, তাসনিম সিদ্দিকী জ্যোতি চুয়াডাঙ্গা জেলার ৪ নম্বর ওয়ার্ড মসজিদপাড়ার এলাকার মৃত ওলিউল্লাহ আহাম্মদ বাবলুর মেয়ে। দুই ভাই-লোটন ও শোভনের বোন জ্যোতি বর্তমানে হোসেন মার্কেট এলাকায় বসবাস করতেন এবং একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করতেন। ঘটনার সময় তিনি ওষুধ সরবরাহের কাজে টঙ্গী মেডিকেলের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন। রবিবার (২৭ জুলাই ) রাত ৮টার দিকে টঙ্গীর হোসেন মার্কেট ইম্পেরিয়াল হাসপাতালের সামনে খোলা ড্রেনে পড়ে তিনি নিখোঁজ হন।