নিজস্ব প্রতিবেদক :
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার পত্তন ইউনিয়নের শ্রীপুর উত্তর-পশ্চিমপাড়ার আম্বর বাড়িতে পূর্বের জমি-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে এক প্রবাসীর পরিবারের ওপর হামলা, বাড়িঘর ভাঙচুর ও মালামাল লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে।
সর্বশেষ গত ২ নভেম্বর সকাল আনুমানিক ৯টা ৩০ মিনিটে মরহুম সেরু মিয়ার পরিবারের ওপর পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
অভিযোগকারী পরিবারের সদস্যরা জানান, ওই বাড়ির মালিক মরহুম সেরু মিয়ার একমাত্র ছেলে মোঃ হেদায়েত উল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে জীবিকার তাগিদে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই-আবুধাবিতে প্রবাস জীবন কাটাচ্ছেন। পরিবারের সুখ-শান্তি ও ভবিষ্যৎ সুন্দর করার স্বপ্ন নিয়ে প্রবাসে কঠোর পরিশ্রম করে উপার্জিত অর্থ দেশে পাঠালেও নিজের বসতভিটায় পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে এখন চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় রয়েছেন তিনি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৭০ সালে মরহুম সেরু মিয়া তাঁর আপন সধ বড় ভাই মরহুম নান্নু মিয়ার কাছ থেকে বসতভিটা ও ফসলি জমি মূল দলিলের মাধ্যমে ক্রয় করেন। এরপর থেকে দীর্ঘ প্রায় ৫০ বছর ধরে ওই জায়গায় শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছিলেন মরহুম সেরু মিয়া ও তাঁর পরিবার।
১৯৭০ সাল থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত মরহুম নান্নু মিয়া জীবিত থাকা অবস্থায় এ জমি নিয়ে কোনো ধরনের বিরোধ বা সমস্যা সৃষ্টি হয়নি বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৩ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্তও দীর্ঘ ২৭ বছর তাঁদের পরিবারের মধ্যে বড় ধরনের কোনো বিরোধের ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।
পরিবারের দাবি, দীর্ঘদিনের শান্তিপূর্ণ বসবাসের পর ২০২০ সালে মরহুম সেরু মিয়ার ছেলে নতুন ঘর নির্মাণের কাজ শুরু করলে জমি নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত হয়। পরবর্তীতে ২০২২ সালে মরহুম নান্নু মিয়ার ছেলেরা মোঃ মিলন মিয়া,ইদন মিয়া,মদন মিয়া,মিলে যৌথভাবে ১৪৪ ধারাসহ চারটি মামলা দায়ের করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এরই মধ্যে সর্বশেষ একটি সালিশে দৌলতবাড়ি দরবার শরিফের পীর সাহেব সৈয়দ নাঈম উদ্দিন আহমেদ সহ অসংখ্য গন্যমান্য ব্যাক্তবর্গ উপস্থিত ছিলেন
মামলাগুলো মরহুম সেরু মিয়ার জীবদ্দশায় পরিচালিত হয় এবং আদালতের রায় তাঁর পরিবারের পক্ষে আসে বলে দাবি করেছেন তাঁরা।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, মামলা চলাকালীন সময়ে একাধিকবার ঝগড়াঝাটি, মারধর, নতুন ঘরবাড়ি ভাঙচুরসহ নানা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার মধ্যেই তাঁরা নতুন ঘরের নির্মাণের বিতরের কাজ সম্পন্ন করেন।
এরপর ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর শুক্রবার সকালে মরহুম সেরু মিয়া ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুর পরও জমি-সংক্রান্ত বিরোধের কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি।
বিষয়টি সামাজিকভাবে মীমাংসার লক্ষ্যে ২০২৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত ছোট-বড় মোট তিনটি সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, প্রতিটি সালিশেই তাঁদের পক্ষে সিদ্ধান্ত এলেও মরহুম নান্নু মিয়ার পরিবারের সদস্যরা সেই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান এবং সালিশের রায় উপেক্ষা করে চলে যান।
এরপর থেকেই তাঁদের পরিবারের ওপর একের পর এক হামলা, বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। তাঁদের দাবি, প্রতিবারই প্রতিপক্ষের পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি ভাড়াটিয়া লোকজন ব্যবহার করে বাড়িতে হামলা চালানো হয়। বাড়ির আসবাবপত্রসহ মূল্যবান মালামাল ভাঙচুর ও লুট করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলেও জানান তারা।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্যমতে, গত ২ নভেম্বর সকাল ৯টা ৩০ মিনিটের দিকে আবারও তাঁদের বাড়িতে হামলা চালানো হয়। এ সময় বাড়িঘর ভাঙচুর ও মালামাল লুটপাট করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তাঁরা। এতে পরিবারের সদস্যরা চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
একজন প্রবাসী যখন হাজার মাইল দূরে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর আশায় নিজের ঘাম ঝরিয়ে উপার্জন করেন, তখন তাঁর সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা থাকে—দেশে থাকা আপনজনেরা যেন অন্তত নিরাপদে নিজের ঘরে বসবাস করতে পারেন। অথচ সেই স্বপ্নের ঠিকানায় যদি বারবার হামলা, ভাঙচুর আর আতঙ্কের ছায়া নেমে আসে, তাহলে একজন প্রবাসীর মানসিক কষ্ট কতটা গভীর হতে পারে, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
প্রবাসে থাকা একজন মানুষের কাছে তাঁর বাড়ি শুধু ইট-পাথরের স্থাপনা নয়; এটি তাঁর শেকড়, স্মৃতি, পরিবার ও সারাজীবনের পরিশ্রমের স্বপ্নের ঠিকানা। সেই বাড়িতে পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা না থাকলে প্রবাসে থেকেও তাঁকে প্রতিনিয়ত দুশ্চিন্তা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে হয়।
প্রশাসনের হস্তক্ষেপ ও ন্যায়বিচারের দাবি
এ ঘটনায় মরহুম সেরু মিয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে বিজয়নগর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
অভিযোগে ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে তাঁদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।
পাশাপাশি তাঁরা প্রশাসনের কাছে নিজেদের জানমাল ও বসতবাড়ির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আবেদন জানিয়েছেন।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, তাঁরা কোনো সংঘাত চান না, চান না প্রতিশোধ কিংবা প্রতিহিংসা। তাঁরা শুধু নিজেদের বসতি বাড়ি এবং ক্রয়কৃত জমি সম্পত্তিতে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাসের অধিকার এবং পরিবারের নিরাপত্তা চান। দীর্ঘদিনের বিরোধের অবসান ঘটিয়ে আইন ও ন্যায়বিচারের মাধ্যমে একটি স্থায়ী সমাধানই তাঁদের একমাত্র প্রত্যাশা।
এখন এলাকাবাসী ও সচেতন মহলের প্রশ্ন—একটি পরিবারের বসতভিটায় বারবার হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত কবে হবে? প্রবাসে থাকা একজন মানুষের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কি রাষ্ট্র ও প্রশাসনের দায়িত্ব নয়?
সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতি ভুক্তভোগী পরিবারের আকুল আবেদন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন, দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তাঁদের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক। কোনো পরিবার যেন নিজ বসতভিটায় থেকেও আতঙ্কে দিন কাটাতে বাধ্য না হয়—এটাই তাঁদের একমাত্র প্রত্যাশা।