
বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলের অন্যায়-অত্যাচারের বিচার প্রচলিত আইন অনুযায়ীই করা হবে, তবে কোনো অবস্থাতেই প্রতিশোধের মানসিকতা থেকে বিচারের নামে অবিচার করা যাবে না বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বিগত ১৭ বছরে নিজের পরিবার ও দলের ওপর নেমে আসা অবর্ণনীয় জুলুমের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, কবরে শুয়ে থাকা স্বজনদের শান্তির জন্য এবং একটি নিরাপদ রাষ্ট্র গড়তে হলে বিচারের নামে অবিচার করা যাবে না। প্রয়োজনে কিছুটা সময় নিয়ে হলেও প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের সঠিক বিচার নিশ্চিত করা হবে।
শনিবার (৪ জুলাই) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের শোক ও বিজয়ের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলন-২০২৬’-এ তিনি এসব কথা বলেন।
নিজের পারিবারিক ও ব্যক্তিগত নির্যাতনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যদি মাকে (বেগম খালেদা জিয়া) জিজ্ঞেস করতে পারতাম— মা, আপনার ওপর ১৭ বছর যে অন্যায়-জুলুম, মানসিক নির্যাতন হয়েছে... তাদের বিরুদ্ধে এখন প্রতিশোধ নেই? মা বলতেন, প্রতিহিংসা নয়, তোমার দায়িত্ব সবাইকে নিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। একই প্রশ্ন করলে আমার ভাইও (আরাফাত রহমান কোকো) একই কথা বলতেন। ১৭ বছর ধরে নিজের রাজনৈতিক সহকর্মীদের হারানোর বেদনা ও শারীরিক-মানসিক যন্ত্রণা তিনিও গভীরভাবে অনুভব করেন বলে জানান।
তিনি জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অন্তত দুই হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ৩০ হাজারের বেশি। আর জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী ৬০ জন শিশু প্রাণ হারিয়েছে। নিহত ও নির্যাতিত প্রতিটি মানুষের স্বপ্ন ছিলো দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। তাই রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সবাইকে বিচারের নামে কারও প্রতি জুলুম না করার আহবান জানান তিনি।
বিগত শেখ হাসিনা সরকারের আমলের অন্যায়ের চিত্র তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, শুধু বিএনপিরই ৬০ লাখ নেতাকর্মী মিথ্যা মামলার কারণে বাড়িছাড়া হয়েছেন। তবে পাঁচ আগস্টের অর্জন কোনো একক ব্যক্তি বা কোনো একক রাজনৈতিক দলের নয়; বরং এই অর্জন দেশের প্রত্যেকটি গণতন্ত্রকামী মানুষের। তাই সবাইকে দল-মত ভুলে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। জাতিকে দ্বিধাবিভক্ত করে দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানুষ দল-মত ভুলে রাস্তায় নেমে এসেছিল, তাই তাদের এই ত্যাগের সম্মান করতে হবে। কাউকে বঞ্চিত করে নয়, সবার ত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে। তিনি বলেন, জাতিকে দ্বিধাবিভক্ত করে দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। যারা বাংলাদেশের অস্তিত্বে বিশ্বাস করে, দেশকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে তাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা মানুষ হত্যা করেছে, তাদের বিচার এ দেশের আইন অনুযায়ী হবে। স্বৈরাচার যেমন বিচারের নামে অবিচার করেছে, আমরা যেন বিচারের নামে কোনো অন্যায় না করি। সে জন্য খেয়াল রাখতে হবে। প্রয়োজনে সময় লাগবে, তবুও আইন অনুযায়ী যেন সঠিক বিচার হয়।
তিনি বলেন, এমনভাবে দেশ গড়তে চাই, যেখানে মানুষ তার ন্যায্য অধিকার ও সম্মান পাবে। যেখানে সবার জন্য নিরাপদ রাষ্ট্র হবে।
জাতিকে দ্বিধাবিভক্ত করে দেশকে এগিয়ে নেওয়া যায় না উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, যারা বাংলাদেশের অস্তিত্বে বিশ্বাস করে, দেশকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে তাদের এগিয়ে আসতে হবে।
অনুষ্ঠানে জুলাই আন্দোলনে শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের সম্মানে ‘জুলাই স্মৃতি স্মারক' তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
জাতীয় সংসদের হুইপ নূরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে এই স্মরণসভায় মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার, সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং পেশাজীবী নেতারা উপস্থিত ছিলেন।