
দেশে নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা, ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন ও হত্যার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় এসব অপরাধকে ‘জাতীয় জরুরি ইস্যু’ হিসেবে ঘোষণার দাবি তুলেছে নারী ও শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা ১৫৬টি সংগঠন ও প্ল্যাটফর্ম। একই সঙ্গে ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নের আহ্বানও জানিয়েছে তারা।
শনিবার (২৩ মে) রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনী মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোটসহ দেশের ৬৪ জেলার নারী ও শিশু অধিকারভিত্তিক ১৫৬টি সংগঠন ও প্ল্যাটফর্ম যৌথভাবে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।
সংবাদ সম্মেলনে সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে শিশু ধর্ষণ ও হত্যাসহ বিভিন্ন ঘটনায় দ্রুত, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতের আহ্বানও জানানো হয়।
লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোটের প্রধান নির্বাহী জিনাত আরা হক। তিনি বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতনের প্রতিটি অভিযোগ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করতে হবে। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের কার্যকারিতা বাড়ানোর পাশাপাশি নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাগুলো ১৮০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে হবে।
জিনাত আরা হক বলেন, “শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, বাস্তবে ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা, চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করাও জরুরি।” তিনি আরও বলেন, বিচার চলাকালে নির্যাতনের শিকার নারী-শিশু ও তাদের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও রাখতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সব প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন, স্বাধীন অভিযোগ গ্রহণব্যবস্থা চালু এবং নিয়মিত মনিটরিংয়ের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে হাইকোর্টের ২০০৯ সালের নির্দেশনা অনুযায়ী যৌন হয়রানি প্রতিরোধে আইন প্রণয়ন ও তার কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন জিনাত আরা হক।
এ ছাড়া সাইবার সহিংসতা, অনলাইন ব্ল্যাকমেইল ও ডিজিটাল যৌন হয়রানি প্রতিরোধে বিশেষ সাইবার মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর দাবি জানানো হয়। থানাগুলোতে নারী ও শিশুবান্ধব ডেস্ক আরও কার্যকর করা এবং অভিযোগ গ্রহণে হয়রানি বন্ধের আহ্বানও উঠে আসে সংবাদ সম্মেলনে।
সংগঠনগুলোর মতে, নারী ও শিশু নির্যাতন কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি সামাজিক নিরাপত্তা, বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির গভীর সংকটের প্রতিফলন। তাই স্থানীয় সরকার, শিক্ষক, নারী সংগঠন, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে সম্পৃক্ত করে জাতীয় পর্যায়ে সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়।
লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, নির্যাতনের তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও প্রকাশে সমন্বিত জাতীয় ডেটাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত ও দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কেন্দ্রীয় ট্র্যাকিং ডেটাবেজ তৈরির দাবিও জানানো হয়।
সংগঠনগুলোর উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১৫টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ১৭৮ জন নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৫০টি ছিল সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৪ জনকে।
একই সময়ে শিশুদের বিরুদ্ধে ১৯৯টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ১২৬টিতে মামলা হয়েছে। শিশু ধর্ষণের ঘটনা ছিল সর্বাধিক ১১৮টি। আর ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ছিল ৪৬টি।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে বক্তব্য দেন নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে কাজ করা ১০১ সহযোগী সংগঠন ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম। তিনি বলেন, দেশে শিশু ধর্ষণ ও সহিংসতা ভয়াবহ মাত্রা নিয়েছে। বিচারহীনতা ও সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে এ ধরনের অপরাধ বাড়ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শাহীন আনাম বলেন, “শুধু ঘোষণা নয়, কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে এমন নজির তৈরি করতে হবে, যাতে কোনো ধর্ষক পার না পায়।”
সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ধর্ষণ মামলার শুধু গ্রেপ্তারের খবর নয়, মামলার অগ্রগতি ও বিচারপ্রক্রিয়ার পরিণতিও নিয়মিতভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সামাজিক দায়বদ্ধতা ও পাড়া-মহল্লাভিত্তিক শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন সেন্টার ফর ওমেন অ্যান্ড চিল্ড্রেন স্টাডিজের অধ্যাপক ইশরাত শামীম, প্রাগ্রসরের নির্বাহী পরিচালক ফওজিয়া খন্দকার এবং বিএনপিএসের পরিচালক শাহনাজ সুমি। এছাড়া কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার একটি মাদ্রাসায় নিপীড়নের শিকার এক শিশুর বাবা উপস্থিত থেকে দ্রুত বিচারের দাবি জানান।