গাজীপুর প্রতিনিধি:
গাজীপুর মহানগরীর ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের পূবাইল খিলগাঁও এলাকায় নাগদা নদীর পাশের কৃষিজমি ও জলাশয়কে কেন্দ্র করে ‘এম্পায়ার সিটি’ নামের একটি কথিত আবাসন প্রকল্পের বিরুদ্ধে রমরমা সাইনবোর্ড ব্যবসা চালানোর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন ও বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই বিশাল আকৃতির সাইনবোর্ড টানিয়ে শত শত বিঘা কৃষিজমি ও জলাশয়কে আবাসন প্রকল্পের আওতাভুক্ত দেখিয়ে জমি বিক্রির পাঁয়তারা করা হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, কোনো ধরনের বৈধ অনুমোদন ছাড়া কৃষিজমি ও জলাশয়ের চরিত্র পরিবর্তন করে সেখানে আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। এতে একদিকে যেমন এলাকার কৃষি ও পরিবেশ হুমকির মুখে পড়ছে, অন্যদিকে সাধারণ কৃষক ও জমির মালিকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ ও ক্ষোভ।
শুক্রবার সরেজমিনে পূবাইলের খিলগাঁও এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ঢাকা সিটি বাইপাস সড়কের নাগদা ব্রিজের পূর্ব পাশে বিশাল আকৃতির একটি সাইনবোর্ড টানানো রয়েছে। ওই সাইনবোর্ডে ইংরেজিতে বড় অক্ষরে লেখা রয়েছে—‘এম্পায়ার সিটি’। সাইনবোর্ড দেখে মনে হতে পারে, সেখানে বড় পরিসরে কোনো অনুমোদিত আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলা হচ্ছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, প্রকল্পটির নামে এলাকায় এক শতাংশ জমিও ক্রয় করা হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধুমাত্র সাইনবোর্ড টানিয়ে এলাকাজুড়ে একটি আবাসন প্রকল্পের পরিবেশ সৃষ্টি করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে কৃষিজমি ও জলাশয় ভরাট করে প্লট আকারে জমি বিক্রির উদ্দেশ্যে এ ধরনের কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের।
খোঁজ নিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পূবাইলের খিলগাঁও এলাকার অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। এলাকার বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদন হয়। পাশাপাশি নাগদা নদী ও আশপাশের জলাশয় এলাকার পরিবেশ ও জীবিকার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জড়িয়ে আছে।
বর্ষা মৌসুমে নাগদা নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন এলাকার অনেক মানুষ। নদী ও জলাশয়কে ঘিরে স্থানীয়দের জীবিকা, কৃষি ও পরিবেশের একটি স্বাভাবিক ভারসাম্য গড়ে উঠেছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, অপরিকল্পিতভাবে কৃষিজমি ও জলাশয় ভরাট করে আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলা হলে শুধু কৃষিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, পরিবেশ ও প্রাকৃতিক জলাধারও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, কৃষিজমি ও জলাশয়ের শ্রেণি পরিবর্তন করে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার চেষ্টা করে, তাহলে তা এলাকার কৃষি ও পরিবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হতে পারে।
এ বিষয়ে স্থানীয় কৃষক নাসির উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের পূর্বপুরুষের পেশা কৃষিকাজ। এই এলাকার অধিকাংশ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কোনো জমি না কিনেও শুধু সাইনবোর্ড টাঙিয়ে তারা কৃষিজমি ভরাট ও বিক্রির পাঁয়তারা করছে বলে আমরা আশঙ্কা করছি।”
তিনি আরও বলেন, “দেশনায়ক তারেক রহমান যখন কৃষিজমি ও জলাশয় রক্ষার কথা বলছেন এবং খাল কাটা কর্মসূচিসহ কৃষির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন, তখন প্রশাসনের নাকের ডগায় কিছু ভূমিদস্যু কৃষিজমি ধ্বংস করতে উঠেপড়ে লেগেছে। কৃষিজমির শ্রেণি পরিবর্তন করে কোনো আবাসন প্রকল্প গড়ে তুলতে দেওয়া হবে না। প্রয়োজন হলে আমরা মানববন্ধনসহ কঠোর কর্মসূচি পালন করব।”
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, পূবাইলের এই এলাকাটি কৃষি ও জলাশয়নির্ভর হওয়ায় এখানে অপরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্প বা আবাসন ব্যবসা শুরু হলে স্থানীয় পরিবেশের ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে। কৃষিজমি কমে গেলে স্থানীয় কৃষকদের জীবিকা সংকটের মুখে পড়বে এবং জলাশয় ভরাট হলে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতাসহ নানা পরিবেশগত সমস্যার সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তারা অভিযোগ করেন, সাম্প্রতিক সময়ে পূবাইলের বিভিন্ন এলাকায় কৃষিজমি ও জলাশয় ভরাটের অভিযোগ বাড়ছে। এ অবস্থায় প্রশাসনের কঠোর নজরদারি না থাকলে একের পর এক কৃষিজমি ও জলাশয় বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় কৃষক ও বাসিন্দারা অনতিবিলম্বে ‘এম্পায়ার সিটি’ নামের কথিত প্রকল্পের বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে অনুমোদন ছাড়া টানানো সাইনবোর্ড উচ্ছেদ এবং কৃষিজমি ও জলাশয় রক্ষায় গাজীপুর জেলা প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।
এ বিষয়ে প্রকল্পটির তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে পরিচিত জুয়েলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, গাজীপুর জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে তিনি কোনো অনুমতি নেননি। তবে স্থানীয় কাউন্সিলরের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়ার দাবি করেন তিনি।
একপর্যায়ে সাংবাদিকের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার জন্য অফিসে আসার অনুরোধ করেন জুয়েল। পরে সংবাদটি প্রকাশ না করার জন্য অনুরোধ জানিয়ে তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, কোনো আবাসন প্রকল্পের কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে শুধু স্থানীয় কোনো জনপ্রতিনিধির অনুমতি যথেষ্ট কি না এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের প্রকল্পের নামে সাইনবোর্ড টানিয়ে প্রচারণা চালানো কতটা বৈধ—সে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক নুরুল করিম ভূইয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “বিষয়টি নিয়ে গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেন, তাহলে সবকিছু জানতে পারবেন।”
পরে গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুল মান্নানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “এম্পায়ার সিটি নামে কোনো প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়নি। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান এ ধরনের কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকে, তাহলে আমরা বিষয়টি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”
গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের এমন বক্তব্যের পর স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে নতুন করে আশার সৃষ্টি হয়েছে। তারা বলছেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত সরেজমিন তদন্ত করে প্রকল্পটির বৈধতা যাচাই করুক এবং কৃষিজমি ও জলাশয় রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করুক।
স্থানীয়দের দাবি, পূবাইলের কৃষিজমি ও জলাশয় শুধু ব্যক্তিমালিকানার সম্পদ নয়; এগুলো এলাকার পরিবেশ, কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অনুমোদন ছাড়া এসব জমির চরিত্র পরিবর্তন করে আবাসন ব্যবসার চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
তাদের অভিযোগ, আজ একটি সাইনবোর্ড টানিয়ে কার্যক্রম শুরু হলে ভবিষ্যতে তা বড় আকারের ভূমি দখল ও কৃষিজমি ভরাটের ঘটনায় রূপ নিতে পারে। তাই শুরুতেই বিষয়টি তদন্ত করে সত্যতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য গাজীপুর জেলা প্রশাসন, গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষক ও বাসিন্দারা।
এদিকে স্থানীয়রা জানিয়েছেন, পূবাইলের পরিবেশ, কৃষিজমি ও জলাশয় রক্ষায় প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে তারা মানববন্ধন, স্মারকলিপি প্রদানসহ বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করবেন।
স্থানীয় কৃষকদের একটাই দাবি—কৃষিজমি ও জলাশয় রক্ষা করতে হবে, অবৈধভাবে কোনো আবাসন প্রকল্পের নামে জমির শ্রেণি পরিবর্তন কিংবা দখল-বাণিজ্য করতে দেওয়া যাবে না।